Montage

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পরিবেশ সংরক্ষণ

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পরিবেশ সংরক্ষণ

” ……চলে যাব – তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার ৷৷”
—- সুকান্ত ভট্টাচার্য্য [ ছাড়পত্র]

আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে কবি যে সুদৃঢ় চিন্তাভাবনা করে গিয়েছিলেন , আজ ২০২১সালে দাঁড়িয়ে তাঁর চিন্তা যেন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ৷ পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য পরিবেশের সাথে জীবজগতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরী ৷ পরিবেশের হলো প্রাণের ধারক ও বাহক | জীবজগৎ ও প্রাণী জগতের এই সহাবস্থানের ওপরেই নির্ভর করে পরিবেশের ভারসাম্য ৷ তা. না হলে নিয়মের রাজত্ব একটা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ৷ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ প্রাণের অস্তিত্বের পক্ষে ক্ষতিকারক ৷ মানুষ যেমন তার প্রয়োজনে পরিবেশকে নিজের উপযোগী করছে,ঠিক তেমনি সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিতে মানুষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে , যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে প্রাণের অস্তিত্ব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে ৷ তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণ করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব ৷

” এমন একটা পৃথিবী চাই
মায়ের আঁচল এর মত
আর যেন ওই আঁচল জুড়ে
গান থাকে
যখন শিশুদের ঘুম পায় ৷ “
——– বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [ এমন একটা পৃথিবী চাই ]

কিন্তু , কোথায় সেই পৃথিবী ? কোথায় সেই নীল আকাশ , পেঁজা তুলোর মতো মেঘ , সবুজের আলপনা , আর দূরে নদীর বুক ছুঁয়ে ছুটে আসা হিমেল বাতাস ? তা তো এখানে নেই ৷ এখানে আছে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির অহংকারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কংক্রিটের জঙ্গল , এয়ার কনডিশনড গাড়ি , বাড়ি আর আছে ধ্বংসের হাতছানি ৷ সভ্যতার গর্বকে গুড়িয়ে দিয়ে পরিবেশ দূষণের কালসাপ তুলেছে ফনা তাই শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বিবেক আজ বিপন্ন ৷ চোখে তাদের ‘ বিপন্ন বিস্ময় ‘ আমরা প্রত্যহ দেখি – ” মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ৷ “

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশের এই অবনতির কারণ খুঁজতে যাচ্ছি তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি এর কারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেই আমরাই ৷ নিজেদের ভোগবিলাস , আরাম প্রিয়তা , নিজের ছোট ছোট সুখ ও স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে সুচতুর ভাবে বসিয়েছি বসুন্ধরা মায়ের উপর ৷ আর এই পরিবেশ দূষিত হওয়ার কারণ একটা নয় , একাধিক | নির্বিচারে অরণ্য উচ্ছেদের কাজে মানুষের হাতে উঠেছে নিষ্ঠুর কুঠার ৷ মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বন-জঙ্গল ধ্বংস করে চলেছে মানুষের বাসস্থান , শিল্প-কারখানা তৈরীর কাজ , বৃক্ষ নিধন করে চলেছে মানুষের সজ্জা সামগ্রী , আসবাবপত্র তৈরির কাজ এছাড়াও রয়েছে বহুবিধ দূষণ পরিবেশের সজীব কোষ ও উদ্ভিদ কুলকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে ৷ রয়েছে , বায়ু দূষণ , জল দূষণ , মৃত্তিকা দূষণ , শব্দদূষণ , তেজস্ক্রিয় জনিত দূষণ ; যেগুলি পরিবেশ অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ৷

→ প্রাকৃতিক সম্ভারের অন্যতম উপাদান বায়ু ৷ কলকারখানা , মোটর গাড়ির কালো ধোঁয়া থেকে উৎপন্ন কার্বন কণা ; ভারী ধাতু , জটিল জৈব যৌগের আবর্জনা , জীবাশ্ম রেফ্রিজারেটর , এসি থেকে উৎপন্ন ক্লোরোফ্লোরো কার্বন – এই সবই হলো বায়ু দূষণের প্রধান কারণ ৷

→ পরিবেশের অন্যতম প্রধান উপাদান হল জল ৷ নদী-নালা , পুকুর , হ্রদ ইত্যাদির জল প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে ৷ শহরের নির্গমন নালী বেয়ে আসা দূষিত তরল , ভারী ধাতু , জলযান থেকে নির্গত তেল , হ্যালোজেন নিঃসৃত হাইড্রোকার্বন দূষণের জন্য দায়ী ৷ মূলত নদীর তীরে গড়ে ওঠে কাপড় কল , পাটকল , কাগজের কল , চিনি কলের মতো বিভিন্ন কারখানা এসব কারখানার আবর্জনা প্রতিনিয়ত জলকে দূষিত করে যাচ্ছে ৷

→ ভূত্বকের আবরণ মৃত্তিকার ওপরেও দূষণের বোঝা বেড়েই চলেছে ; বৃক্ষচ্ছেদন , ভূমিক্ষয় , বন উজাড় , অ্যাসিড বৃষ্টি , জমিতে অত্যাধিক রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে মাটির গুণগত মান নষ্ট হয় ৷

→ এছাড়াও , বিভিন্ন ধরনের অটোমোবাইল , কলকারখানার শব্দ , বাজি পটকার শব্দ , মাইকের আওয়াজ , রেডিও-টেলিভিশনের মাত্রাতিরিক্ত আওয়াজে সৃষ্টি হয় শব্দ দূষণ ৷

→ দেদার গাছ কাটার ফলে গাছের সংখ্যা যেমন কমেছে , তেমনি বিপন্ন হচ্ছে বন্যপ্রাণ ; তারা হারিয়েছে তাদের বাসস্থান ; ধীরে ধীরে কমেছে বন্য প্রাণীর সংখ্যা |

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে তেজস্ক্রিয় দূষণের পরিমানও পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে ৷ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য , পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এই ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় তার অধিকাংশ বিকিরিত হয় , যা আমাদের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে , বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ভয়ানক ক্ষতিসাধন করে ৷

আজ বিশ্বব্যাপী যে ক্ষয় ও রিক্ততা , মৃত্যু ও মহামারী তার কারণ হলো পরিবেশের অবনতি ৷ প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতায় ঋতু চক্রের আবর্তন ক্রমবিপর্যস্ত , মরুভূমি ক্রমবিস্তৃত এবং বৃষ্টিপাত অনিয়মিত | ফলে খরা ও বন্যা আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে ৷ ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়ায় গলে যাচ্ছে মেরুপ্রদেশের বরফ | তাতে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৷ এতে সারা বিশ্বব্যাপী নিচু জমি জলমগ্ন হবে ৷ আশঙ্কা করা হচ্ছে , আগত ৫০ বছর পর হয়তো বিশ্বের বহু সমুদ্র তীরবর্তী শহর এর সলিল সমাধি ঘটবে ৷ এর সাথে কৃষির ক্ষতি হবেও মারাত্মক ৷ পৃথিবীতে একইসাথে নেমে আসবে খাদ্যাভাব , জলাভাব ও স্থানাভাব ৷ বসুন্ধরা আজ সহনশীলতার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ৷ ভূ-পৃষ্ঠে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ঘন-ঘন দাবানলের সৃষ্টি হয় গাছপালার সব ধ্বংস হয়ে যাবে ৷ অ্যাসিড বৃষ্টি নেমে আসবে বসুন্ধরার বুকে ৷ অন্যদিকে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারবে না ৷ পৃথিবীতে নেমে আসবে চিরশৈত্য | বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘ নিউক্লিয়ার উইন্টার ‘ , এর ফলে ধ্বংস হবে জীবন , বিলুপ্ত হবে প্রাণের অস্তিত্ব ৷ এক সমীক্ষা বলছে , ২০৫০ সালের মধ্যে আরব সাগরের জলস্তর প্রায় ৫০ সেমি বাড়বে , ফলে ভারতের ৭.১ কোটি মানুষ ও ৫৭৬৪ বর্গ কিমি বর্গকিমি জমি বিপন্ন হবে ৷ ২০২১ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বাড়বে ১০.৪° F ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৫০ কোটি মানুষ ৷ আজ শঙ্কিত হৃদয় শিকার করে – ” অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ ৷ “

এই সুবিশাল মানবগোষ্ঠীর সহ প্রাণী জগৎ কিভাবে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে সে উপায় নির্ধারণে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা অবিরাম কাজ করে চলেছে ৷ আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের এই পরিবেশকে সংরক্ষিত করার নানাবিধ উপায়ের মধ্যে অন্যতম প্রধান উপায় হল – মানুষের সচেতনতা ; যতদিন না প্রতিটি মানুষ পরিবেশের প্রতি তার কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন না হবে ; ততদিন এই অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয় ৷ আজ শুধুমাত্র মানুষের ও সচেতনতার অভাবে ও লোভের বসে পরিবেশের এমন অবস্থা হয়েছে যে সরকারকে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য নানাবিধ আইন প্রণয়ন করতে হয়েছে ৷ পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ১৯৮০ সালে ‘ বনভূমি সংরক্ষণ আইন ‘ ; রয়েছে ‘ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ‘ , ১৯৭২ ; রয়েছে ২৯৭৪ সালে প্রণীত হওয়া ‘ জল সংরক্ষণ ও দূষণ রোধের আইন ‘ ; পরিবেশ সংরক্ষণের এই কর্মযজ্ঞকে আরও ত্বরান্বিত করে তোলার জন্য ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রাজধানী রিও – ডি – জেনিরো তে ১৮০ টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগন মিলিত হয়ে প্রতিবছর ৫ ই জুন ‘ বিশ্ব পরিবেশ দিবস ‘ হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেন ৷ এই দিন মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট ফলপ্রসূ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নই ‘ বিশ্ব পরিবেশ দিবস ‘ – এর অন্যতম লক্ষ্য ৷ এই উপলক্ষে রাষ্ট্রপুঞ্জ নির্দেশিত কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – বনসৃজন ও সংরক্ষণ , অতিরিক্ত কয়লার ব্যবহার হ্রাস , দূষণমুক্ত নতুন শক্তির উৎস সন্ধান , জলকে দূষণমুক্ত বা শোধন করা , মহাকাশে রকেট নিক্ষেপণ এবং পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করণ ইত্যাদি ৷ তবে শুধুমাত্র কিছু সম্মেলন বা বক্তৃতা বা বিশেষ দিন ভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে এই মারণ যজ্ঞের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় ৷ এর জন্য প্রত্যেক মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে এবং ছাত্র ছাত্রীদের নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা ৷

” আলো চাই , চাই মুক্ত বায়ু
চাই বল , চাই স্বাস্থ্য , আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু
সাহস বিস্তৃত বক্ষপট ৷ “
—— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ এবার ফিরাও মোরে ]

মানুষের এই করুণ আর্তি আজ মানুষকেই উপলব্ধি করতে হবে ৷ পৃথিবীর সভ্যতাদর্পী মানুষ নির্মল বসুন্ধরার মাঝেই পেতে চাইছে সত্য , শিব এবং সুন্দরকে | আমাদের এই অপরূপ নির্মল প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তার তুলিতে আঁকা যেন এক নিখুঁত ভাস্কর্য ৷ পরিবেশ প্রকৃতি তো শুধুমাত্র মানুষকে নিয়েই গড়ে উঠেছে তা নয় ; পরিবেশ হলো প্রতিটি জীব ও জড়ের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ৷ যার ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার দরুন ঘটে চলেছে একের পর এক মহা বিপর্যয় ৷ তাই এর থেকে রক্ষা পেতে এগিয়ে আসতে হবে প্রতিটি মানুষকে ; হতে হবে এক সমাজসচেতন সুনাগরিক ৷ তবেই সংরক্ষিত হবে আমাদের এই পরিবেশ ৷ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলায় হোক প্রধান লক্ষ্য ৷

0

Ipshita Kumar, Acme Academy , Kalna

My favourite subject is history. My hobbies are reading story books , crafting , drawing and gardening. I also love travelling. All my family members always support me to fulfill my dreams.

View All Authors >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − six =

Supported by:

skgf
skgf

Editor's Picks

Archive

Select a month to view the archive.

Back to Top